নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ম্লান হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিবাচক দিক: ভয়েস নেটওয়ার্ক।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামগ্রিকভাবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সেই অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম ভয়েস নেটওয়ার্ক।সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-র সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দীন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সেক্রেটারি একরামুল হক সায়েম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইমপ্যাক্ট ইনিশিয়েটিভের সিইও এনায়েত হোসেন জাকারিয়া এবং রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর বুরহান উদ্দীন। এ সময় হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির সিইও ইজাজুল ইসলাম ও বাকেরগঞ্জ ফোরামের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম হাওলাদারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
১,০৬৯ পর্যবেক্ষক, ৩,৫৪১ কেন্দ্র
ভয়েস নেটওয়ার্কের আওতাধীন নিবন্ধিত কয়েকটি পর্যবেক্ষক সংস্থা যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। মোট ১,০৬৯ জন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দেশের ১৫০টি আসনের ৩,৫৪১টি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে ১,০০৮টি কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতীতের তুলনায় এবারের নির্বাচনকে অনেকাংশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলা যায়। ভোটার উপস্থিতি ও অংশগ্রহণও ছিল সন্তোষজনক। তবে ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন বিভাগে সহিংসতা শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতার চিত্র
প্রতিবেদনে বেশ কিছু অনিয়ম ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার তথ্য উঠে এসেছে—
-
প্রায় ৭% কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের প্রবেশ ও কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে; আইডি কার্ড ও অনুমোদন পেতে বিলম্ব হয়েছে।
-
৭% কেন্দ্র বাইরে থেকে শনাক্তযোগ্য ছিল না; অনেক কেন্দ্র জীর্ণশীর্ণ স্থাপনায় স্থাপন করা হয়েছে।
-
১১% কেন্দ্রে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ভোটারদের জন্য যাতায়াতের পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না।
-
প্রায় ২০% কেন্দ্রে গর্ভবতী নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল।
-
১১% কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি পর্যাপ্ত ছিল না।
-
প্রায় ১৫.৫% ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
-
৪৯% কেন্দ্রে অনুমোদনবিহীন ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
-
প্রায় ৪% কেন্দ্রে কোনো না কোনো পক্ষের পোলিং এজেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন; কিছু আসনে এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
-
কিছু ক্ষেত্রে ব্যালট ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে।
-
প্রায় ৮% ক্ষেত্রে ভোটারদের পরিচয় যথাযথ যাচাই ছাড়াই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে।
-
৪% কেন্দ্রে জাল ভোটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
-
৫.৮% কেন্দ্রে ভোটাররা হুমকি বা ভীতির কারণে ভোট না দিয়েই ফিরে গেছেন।
গণনা ও ফলাফল প্রকাশে ঘাটতি
ভোট গণনা ও ফলাফল টেবুলেশনের ক্ষেত্রেও কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু কেন্দ্রে গণনা প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব ছিল এবং ব্যালটের বৈধতা যাচাইয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা গেছে। তথ্য সমন্বয় ও ফলাফল প্রেরণে বিলম্ব হয়েছে। কোথাও কোথাও পর্যবেক্ষকদের গণনার সব ধাপে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমের কভারেজ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু সংবাদমাধ্যম পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে, যা ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি ও আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ফলাফলের পর সহিংসতা: ৪০ জেলায় অন্তত ৭০ ঘটনা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা। ভয়েস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় সব বিভাগে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ পর্যন্ত ৪০টি জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংসতার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাগেরহাট ও মুন্সিগঞ্জ-এ দুজন নিহত হয়েছেন। নোয়াখালী-তে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে এক নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া দিনাজপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, ফেনী, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও বরগুনা-সহ বিভিন্ন জেলায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
ভয়েস নেটওয়ার্ক সতর্ক করে বলেছে, নির্বাচনকালীন ইতিবাচক দিকগুলোকে এ ধরনের সহিংসতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- দৈনিক পঞ্চকন্ঠ নিউজ ডেস্ক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন